শরীয়ত ও তরীকতের শাহান শাহ হযরত আলী (রাঃ) - ১ম পর্ব

শরীয়ত ও তরীকতের শাহান শাহ হযরত আলী (রাঃ)


শরীয়ত ও তরীকতের শাহান শাহ হযরত আলী (রাঃ)


খাতামুন্নবীয়ীনের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পবিত্র আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে গেছে নবুয়তরূপী হিদায়াতের স্বর্গীয় ধারা। কিন্তু তারপরও অব্যাহত রয়েছে মহান রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতের বার্তাবাহক তরীকতের ইমামগণের সূচিত হিদায়াতের অমিয় প্রবাহ। এটাকে বলা হয় বেলায়েতের সিলসিলা। এদের মাধ্যমে যুগে যুগে পথহারা মানবমন্ডলী আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সঠিক দিক নির্দেশনা লাভে ধন্য হয়েছে ও হচ্ছে। এসব মহামানবগণের সুদীর্ঘ তালিকার সর্বাগ্রে যে নামটি পরম শ্রদ্ধাভরে বিশ্বব্যাপী উচ্চারিত হয়ে আসছে- তিনি হলেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত সৈয়্যেদিনা আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ)। তিনি যে একজন নবী পরিবারের সদস্য ও বিশিষ্ট সাহাবী ছিলেন- শুধু তাই নয়, তৎকালীন কুরাঈশ গোত্রে যে ১৭ জন শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন, তাঁদের মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন শীর্ষস্থানীয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে- তিনি বাল্যজীবন থেকেই মহানবী (দঃ)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ও সযত্নে একজন সত্যিকার আদর্শবান ব্যক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছিলেন। হৃদয়ে ধারণ করতে পেরেছিলেন সত্যিকার ইসলামী মূল্যবোধ ও ধ্যান-ধারণা। জীবন্ত কুরআন স্বরূপ মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনাচরনকে খুব কাছ থেকে অতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন ও অনুসরণ করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন তিনি। আমৃত্যু মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনের প্রতিটি ঘটনা আর ঘটনার পিছনের ভূমিকা- তথা ইতিহাসের চাক্ষুষ সাক্ষী বা প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছিলেন হযরত আলী (রাঃ)। হাদীসের পবিত্র বাণীতেও একথার প্রমাণ মিলে।

যেমন- হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন যে, “হে আলী তুমি আমার নিকট ঠিক তদ্রুপ- হযরত হারুন (আলাইহিস সালাম) যদ্রুপ ছিলেন হযরত মুসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট। কিন্তু আমার পরে কোন নবী নেই”।

পবিত্র কুরআন ও হাদীস শাস্ত্রে হযরত আলীর (রাঃ) জ্ঞানরাশি ছিল অপরিসীম। তাই মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,“আমি হচ্ছি জ্ঞানের শহর, আর আলী হচ্ছে তার দরওয়াজা স্বরূপ” । হযরত আলী (রাঃ) বলেন, “কুরআন পাকে এমন কোন আয়াত নাই, যার অবতীর্ণের কারণ সম্পর্কে আমি অবগত নই”।


হযরত মাওলা আলীর শান ও মর্যাদা

হযরত আলী (রাঃ)-এর মর্যাদা সম্পর্কিত কয়েকটি হাদীস দ্বারাই তাঁর প্রকৃত মর্যাদার পরিধি সম্পর্কে আন্দাজ করা যায় । উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) বলেন-হযরত রাসুলে করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন যে, “আলী কুরআনের সাথে এবং কুরআন আলীর সাথে।” হযরত আলী (রাঃ) অহী লিখকও ছিলেন। হযরত রাসুলে করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যক্তিগত সহকারী ও প্রতিনিধির দায়ীত্ব পালন করতেন তিনি। এমনকি হযরত ওমরের (রাঃ) খিলাফত কালেও তিনি কিছু সময়ের জন্য ভারপ্রাপ্ত খিলাফতের মহান দায়ীত্বপালন করেছিলেন। আবার মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবদ্দশায় তাবুক অভিযানকালে খোদ নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে তাঁকে মদিনার গভর্ণর -এর দায়ীত্বভার অর্পণ করেছিলেন।

তাছাড়া, সে যুগের প্রতিটি যুদ্ধেই হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন মুসলমানদের নিশানবরদার বা পতাকাবাহী।

*হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন- “খোদার কসম! রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পর সমস্ত এলেমকে দশ ভাগ করে আলীকে (রাঃ) একাই নয়ভাগ দেয়া হয়েছে। আর বাকী দশমাংশ অপরাপর সমস্তের মধ্যে বন্টন করা হয়েছে।"

*হযরত আলী (রাঃ)-এর অসাধারণ বিচার বুদ্ধির স্বীকৃতি দিয়ে হযরত ওমর (রঃ) বলেন, “আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ফয়সালাকারী হচ্ছেন আলী।" হযরত আলীর (রাঃ) বিচক্ষণতার প্রশংসা করতে গিয়ে হযরত ওমর (রাঃ) প্রায়ই বলতেন, “আলী না থাকলে ওমর হালাক হয়ে যেত।”

*অষ্টম হিজরী সনে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় সংঘটিত হয়। কাবা ঘরে প্রবেশ করে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাজরে আসওয়াদে চুমো খেলেন এবং কাবা ঘরের ভিতরের মূর্তিগুলো বাইরে ফেলে দিলেন। একটা মুর্তি অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় থাকায় হযরত আলীকে (রাঃ) নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজ কাঁদে উঠিয়ে নিয়ে সেটা নামিয়ে দিতে আদেশ দিয়েছিলেন।

* দশম হিজরীতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে হযরত আলীকে (রাঃ) ইয়ামান পাঠান। আলী (রাঃ) ইয়ামান রওয়ানা হওয়ার সময় স্বয়ং রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পাগড়ী পড়িয়ে দেন এবং দোয়া করেন। অল্প দিনের মধ্যেই ইয়ামানবাসীরা ইসলাম কবুল করে। আলী (রাঃ) যখন ইয়ামানে ছিলেন তখন তাঁকে দেখার জন্য রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তিনি দোয়া করেন- “হে আল্লাহ! আলীকে না দেখে যেন আমার মৃত্যু না হয়”। বিদায় হজ্বের দিন হযরত আলী (রাঃ) ইয়ামান থেকে মক্কায় এসে হাযির হন।

* শাহজাহান মোঃ ইসমাঈল

(সুন্নী বার্তা, বুলেটিন নং- ৬৪,পৃঃ ২৭,২৮)


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন