রোম সম্রাট হিরাকল এর দরবারে প্রিয় নবী সম্পর্কে হযরত আবু সুফিয়ান (রাঃ) এর সত্য সাক্ষ্য - ২য় পর্ব
প্রিন্সিপাল হাফেয মুহাম্মদ আব্দুল জলীল (রহঃ)
ইমানের প্রকৃত অবস্থা এটাই একবার যখন সানন্দে করে অন্তরে ধর্ম প্রবেশ করে, তখন সেখানেই স্থায়ীভাবে অবস্থান করে। এরপর তুমি বলেছো- তাঁর অনুসারীর সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটাই ঈমানের প্রকৃত অবস্থা, তা বৃদ্ধি পেতে পেতে পূর্ণতা লাভ করে। তুমি স্বীকার করেছো যে, তাঁর সাথে তোমাদের অনেক যুদ্ধ হয়েছে তবে যুদ্ধগুলো ছিল পালাবদলের মত- কখনও তোমরা বিজয়ী হয়েছো, কখনও তাঁরা বিজয়ী হয়েছেন। এভাবেই রাসুলগণকে পরীক্ষা করা হয়। পরিনামে তাঁরাই বিজয়ী হয়ে থাকেন। তুমি আরো বলেছো- তিনি এখনও চুক্তি ভঙ্গ করেন নি। রাসুলগনের নীতিই হচ্ছে চুক্তিভঙ্গ না করা। তুমি আরো বলেছো- এর পূর্বে অন্য কেউ তাঁর বংশে নবুয়ত দাবী করেনি। যদি এরূপ কেউ করে থাকতো তাহলে বুঝতাম তিনি অন্যের অনুকরনে তা করেছেন।
হাদীস বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন-
সম্রাট হিরাকল আরও কিছু প্রশ্ন করলেন।
হিরাকলঃ তিনি তোমাদেরকে কি কি বিষয়ে নির্দেশ দিয়ে থাকেন?
আবু সুফিয়ান : তিনি আমাদেরকে নামায আদায় করতে, যাকাত দিতে.. নিকট আত্মীয় ও হক্বদারদের হক আদায় করতে এবং অবৈধ ও অসৌজন্যমূলক কাজ থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দিয়ে থাকেন।
হিরাকলঃ হে আবু সুফিয়ান, তুমি তাঁর সম্পর্কে যা বলেছো তাঁর অবস্থা যদি ঠিক তাই হয়, তবে তিনি অবশ্যই নবী। আমি জানতাম যে, একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে। কিন্তু আমি ধারনা করিনি যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই হবেন। “আমার পক্ষে যদি তাঁর নিকট পৌঁছানো সম্ভব হতো তাহলে তাই করতাম এবং তাঁর মোবারক চরনযুগল ধৌত করে দিতাম। জেনে নাও, তাঁর রাজত্ব আমার দু'পায়ের নিচ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে”।
এরপর সম্রাট হিরাকল রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পত্রখানা তলব করলেন এবং পাঠ করে শুনালেন।
পত্রখানা নিম্নরূপঃ
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
এই দাওয়াতী পত্র মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (দঃ)-এর পক্ষ হতে- রোমের মহান ব্যক্তি হিরাকলের প্রতি । সালাম সেই ব্যক্তির উপর- যিনি হেদায়াতের সঠিক পথ অনুসরণ করেন। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন- নিরাপত্তা লাভ করুন। আপনি মুসলমান হোন! আল্লাহ্ আপনাকে দ্বিগুন পুরষ্কার দান করবেন। আর যদি বিমূখ থাকেন- তবে নিশ্চয়ই প্রজাদের অপরাধ আপনার উপর বর্তাবে" । তারপর তিনি আল্লাহর এই বানী শুনালেন- “হে আহলে কিতাব! তোমরা আসো সে কথায় যা তোমাদের ও আমাদের মধ্যে একইরূপ- “আমরা যেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করি, অন্য কাউকে যেন তাঁর শরীক না বানাই এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে যেন মাবুদ না বানাই"। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে তাহলে- হে হাবীব! বলে দিন, তোমরা সাক্ষী থাকো- আমরা মুসলিম বা অনুগত"। (সূরা আলে ইমরান- ৬৪ আয়াত)।
হযরত আবু সুফিয়ান (রাঃ) বলেন- তখন থেকেই আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো যে, নিশ্চয়ই তিনি বিজয়ী হবেন। অতঃপর আল্লাহ আমার অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করিয়ে দিলেন (মুসলিম শরীফ হাদীস নং ৪৪৫৬- হযরত ইবনে আব্বাস সূত্রে হাদীস সমাপ্ত)।
বিঃদ্রঃ হযরত আবু সুফিয়ান (রাঃ) মক্কা বিজয়ের দিন ৮ম হিজরীতে স্বপরিবারে ইসলাম গ্রহণ করে জলিলুল কদর সাহাবীতে পরিনত হন- যেমন হয়েছিলেন তাঁর পূর্বে হযরত ওমর (রাঃ)। তাঁর পুত্র হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) পিতার পূর্বেই ৬ষ্ঠ হিজরীতে হোদায়বিয়ায় এসে গোপনে মুসলমান হয়েছিলেন (মিরআত শরহে মিশকাত) সহীহ্ বুখারী শরীফে হযরত আবু সুফিয়ান ও হযরত মুয়াবিয়ার রেওয়ায়াত ইমাম বুখারী গ্রহণ করেছেন। সুতরাং নিঃসন্দেহে তাঁরা আদেল ছিলেন। শিয়ারা বংশগত ধূয়া তুলে পিতাপুত্রের বিরুদ্ধে আজগুবী কথা রচনা করে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। সুন্নী মুসলমানরা একথা বিশ্বাস করে যে, অনেক সাহাবীই ইসলাম গ্রহনের পূর্বে নবীজীর ঘোরতর শত্রু ছিলেন- যেমন হযরত ওমর (রাঃ)। কিন্তু ইসলাম গ্রহনের পর তাঁরাই হয়েছেন খাঁটি সাহাবী।
কোন মুসলমানই একজন সাহাবীর তুল্য হতে পারেনা।তা ই যেকোন সাহাবীর সমালোচনা করা হারাম। আল্লাহ পাক সমস্ত সাহাবীদের প্রশংসা করেছেন।
(সুন্নী বার্তা, বুলেটিন নং ৬৪,পৃঃ ২৬)
