শরীয়ত ও তরীকতের শাহান শাহ হযরত আলী (রাঃ)
* নবীজীর (দঃ) দৃষ্টিতে বিবি ফাতেমা (রাঃ)-এর জন্য হযরত আলীই (রাঃ) ছিলেন উপযুক্ত পাত্র। তিনি নিজেই বলেছেন- “যদি আলী না হত, তাহলে ফাতিমার জন্য স্বামী পাওয়া যেত না"। দ্বিতীয় হিজরী সনে নবী নন্দিনী খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা (রাঃ)-এর সাথে হযরত আলীর (রাঃ) বিবাহ সম্পন্ন হয়। স্বয়ং নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উদ্যোগী হয়ে এ বিয়ে পড়ান এবং নিজের ওযুর পানি দুলহা-দুলহীনের উপর ছিটিয়ে দিয়ে দোয়া করেন। হযরত আলীর (রাঃ) ওয়ালিমা অনুষ্ঠানটি তৎকালীন সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান ছিল বলে হযরত আসমা (রাঃ) মত প্রকাশ করেছেন।
* এক হাদীসে আছে, হযরত রাসুলে করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন, “আলী আমা হতে এবং আমি আলী হতে।
সুতরাং আমার পক্ষ হতে একমাত্র আলী ছাড়া অন্য কারও কোনরূপ ওয়াদা করার অধিকার নাই”। “রাসূলে করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর ওফাতের পর হযরত আলী (রাঃ) তাঁকে গোসল দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
* হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, একদা রাসুলে করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন, “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) কে তাঁর প্রিয় দোস্ত (খলিল) হবার কারণে সর্বপ্রথম পোষাক পরিধান করাবেন, অতঃপর আমাকে এবং তারপর আলীকে পোষাক পরানো হবে।' সাহাবী জাবের (রাঃ) বলেন, একদা আমরা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দরবারে বসে বেহেশত সম্পর্কিত আলোচনা করছিলাম। কথায় কথায় রাসুলে করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “বেহেস্তে আমি ছাড়া নবীদের পর সর্ব প্রথম প্রবেশ করবে হযরত আলী।”
কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যাদানকারী হযরত আলী (রাঃ)
ঐতিহাসিকগণের মতে হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন সাহাবাগণের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় পন্ডিত ব্যক্তি। তিনি একাধারে কুরআন, হাদীস শাস্ত্র, ফিকাহ শাস্ত্র, কালাম শাস্ত্র, ব্যাকরণ, গণিত, সাহিত্য- প্রভৃতি বিষয়ে অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।
হযরত আলী (রাঃ) নিজে বলেছেন, “আল্লাহরকসম! কুরআনের এমন কোন আয়াত নাই যা আমি জানি না- তা রাত্রে নাজিল হয়েছে বা দিনে, যুদ্ধের ময়দানে নাযিল হয়েছে বা পর্বতের গুহায় অর্থাৎ যেখানেই নাযিল হয়ে থাকুক না কেন- সমস্ত আমার জানা আছে"। তিনি ছিলেন কুরআনে হাফিয ও একজন শ্রেষ্ঠ মুফাসসির। রাসুলে করীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সার্বক্ষণিক সাহচর্য্যে থাকার কারণে হাদিস শাস্ত্রেও তিনি অসামান্য পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। হযরত আলী (রাঃ) ফিকাহ শাস্ত্র তথা মাসলা মাসায়েলের ব্যাপারে অতীব অভিজ্ঞ ছিলেন। পূর্ববর্তী খলিফাদের যুগে যাঁরা ফতোয়া দিতেন- তিনি ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
সাহাবাগণের মধ্যে তাঁর তুল্য জ্ঞান অন্য কারও ছিল না। হযরত আলী (রাঃ) নিজের সম্বন্ধে বলেন, “আমি যা বলছি- তা কুরআনের কাছে জিজ্ঞেস কর- আমি বলেছি কিনা।"
ইমাম আযম (রাঃ)-এর মতো জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ফকীহ'র ওস্তাদ ছিলেন ইমাম জাফর সাদিক ও ইমাম বাকের (রাঃ)। তাঁরা উভয়েই ছিলেন হযরত আলী (রাঃ) এর বংশধর, ছাত্র ও অনুসারী।
* এলমে কালাম ও আকাঈদ শাস্ত্রে প্রধানতঃ তাওহীদ ও রিসালাত সম্পর্কে চর্চা হয়ে থাকে। হযরত রাসুলে করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে নিবিড় সম্পর্কের কারণে তিনি কালাম শাস্ত্রেও বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। মদিনার ওলামাদের প্রধানতঃ চারটি সম্প্রদায় ছিল। তাঁদের প্রত্যেকেই হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকট হতে শিক্ষা লাভ করেছিলেন।
* ফারায়েজ শাস্ত্রেও তিনি অপরিসীম অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, “এলমে মিরাছ বা ফারায়েজ শাস্ত্রে হযরত আলী (রাঃ) অপেক্ষা বিজ্ঞ ব্যক্তি কেহই ছিলেননা" ।
* এলমে মারেফাত বা আধ্যাত্মিক শাস্ত্রে হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন পথের দিশারী বা আলোকবর্তিকা স্বরূপ । হযরত আলী (রাঃ) একদিন কথা প্রসঙ্গে হযরত ওমর ফারুককে (রাঃ) বলেন, “আল্লাহর তত্ত্বজ্ঞান আমাকে যা দান করা হয়েছে, তা যদি লোক সমাজে ব্যক্ত করতে যাই, তবে শরীয়ত আমাকে হত্যা করার নির্দেশ দেবে।" এ কারণেই যেকোন ছিলছিলা বা তরীকাপন্থীগণ তাঁকে মারেফতের শাহেনশাহ্ তথা সম্রাট রূপে স্বীকার করেন।
নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন- “আমি ইলেমের শহর, আর আলী ঐ শহরের সিংহ দরজা"।
* আরবী ভাষার ব্যাকরণে হযরত আলীর (রাঃ) জ্ঞান ও যোগ্যতা ছিল সর্বাপেক্ষা শীর্ষস্থানীয়। তাঁরই নির্দেশে হযরত আবুল আসওয়াদ (রাঃ) সর্বপ্রথম আরবী ব্যাকরণ বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।
* হযরত আলী (রাঃ)-এর কাব্য প্রতিভা ছিল অভাবনীয় ও বিস্ময়কর । একদিকে বীরত্বব্যঞ্জক কাব্য এবং অপরদিকে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উপদেশমূলক কাব্য রচনায় তাঁর সমান দক্ষতা আর কারো ছিলনা। হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন একজন বড় ইসলামী কবি ও সুবক্তা। 'দিওয়ানে আলী’ নামে কাব্য সংকলনে তাঁর অনেকগুলো কবিতা রয়েছে। এর মোট শ্লোক সংখ্যা ১৪০০।
বক্তৃতা প্রদানে হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন আরবে শ্রেষ্ঠ। তাঁর বক্তৃতার ভাব-ভাষা- তেজস্বীতা-সর্বোপরি আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি এবং শ্রোতার মনে প্রভাব বিস্তারের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা অতি বিস্ময়কর।
এক কথায় অসি, মসী ও জিহ্বা চালনায় তিনি সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন। ইমাম আহমদ (রাঃ) বলেন, “হযরত আলীর (রাঃ) মর্যাদা ও ফযীলত সম্পার্কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে যত কথা বর্ণিত হয়েছে অন্য কোন সাহাবী সম্পর্কে তা হয়নি। হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন মুসলমানদের জন্য অহংকার। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “একমাত্র মুমিন ছাড়া তোমাকে কেউ ভালবাসবে না। একমাত্র মুনাফিক ছাড়া তোমাকে কেউ হিংসা করবে না।" বস্তুতঃ তিনি ছিলেন শরীয়তের সুক্ষ্মদর্শী ও তত্ত্বজ্ঞানে পরিপক্ক এবং নবূয়তী জ্ঞানের গভীরে অবগাহণকারী মহাপন্ডিত।
বিঃ দ্রঃ হযরত আলী (রাঃ) শহীদ হন ২১শে রমযান ৪০ হিজরী সনে মুসলমান নামধারী এক খারেজীর হাতে।
(সুন্নী বার্তা, বুলেটিন নং- ৬৪,পৃঃ ২৮,২৯)
%20%E0%A7%A8%E0%A7%9F%20%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC%20%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6.jpg)