জেরাল্ড এফ ডার্কস
এখানকার প্রতি তিনটার মধ্যে দু'টো বিয়েই মাঝপথে ভেঙে যাচ্ছে, আমাদের স্কুলসমূহে ও রাজপথে ভায়ােলেন্স বর্ধিত হারে বেড়ে যাচ্ছে। এটা হয়ে পড়ছে এখানকার নাছােড় - বৈশিষ্ট্য। দায়িত্বশীলতা ক্ষীয়মান। স্ব-শৃঙ্খলা ডুবে যাচ্ছে, যা ভালাে মনে কর তাই কর' মানসিকতায়। ক্রিশ্চিয়ান নেতা ও প্রতিষ্ঠানসমূহ ক্রমাগত যৌন ও আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ছে। মানুষের আচরণ হয়ে পড়েছে আবেগনির্ভর, তা যতই উদ্ভট হােক না কেন। আমেরিকান সংস্কৃতি দেউলিয়া প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে ব্যক্তিগত ধর্মানুশীলনে ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছি।
জীবনের এ রকম এক সন্ধিক্ষণে আমি স্থানীয় কিছু মুসলিমের সান্নিধ্যে আসি। এর কয়েক বছর পূর্ব হতে আমি ও আমার স্ত্রী আরবি ঘােড়ার ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণা করছিলাম।
ঘটনাক্রমে কিছু কিছু আরবি ডকুমেন্ট অনুবাদ করার প্রয়ােজনে আমরা কিছুসংখ্যক আরব-আমেরিকান মুসলমানদের সান্নিধ্যে আসি। এ কাজে সর্বপ্রথম জামাল নামের একজন ভদ্রলােকের সাথে পরিচিত হই। তখন ১৯৯১ সালের গ্রীষ্মকাল। আমাদের সাথে জামালের আলাপ হয় টেলিফোনে। পরে তিনি আমাদের বাসায় আসেন। আমাদের জন্য তিনি কিছু অনুবাদ করে দিতে ও মধ্যপ্রাচ্যে আরবি ঘােড়ার ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণা কাজে যথাসাধ্য সাহায্য করতে রাজি হন। সেদিন বিকেলে বিদায় নেয়ার পূর্বে নির্ধারিত নামায আদায় করার জন্য অজু করতে আমাদের বাথরুম ব্যবহার করার অনুমতি চাইলেন জামাল। সাথে চাইলেন একটা পুরনাে পত্রিকা, যা তিনি জায়নামায হিসাবে ব্যবহার করতে পারেন। তিনি আমাদের বাসা থেকে চলে যাওয়ার পূর্বেই দিনের নির্ধারিত নামায সেরে যেতে চান। আমরা এতে সানন্দে রাজী হলাম।
চিন্তা করলাম নামায পড়ার জন্য পুরনাে পত্রিকা দেয়ার চাইতে আরাে উত্তম কিছু দেয়া যেত কিনা। আমরা তখন যদিও বুঝতে পারিনি, আসলে জামাল সেদিন একটি সুন্দর মনােরম পদ্ধতিতে তাঁর দাওয়াতি কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি কখনাে বলেননি যে আমরা মুসলমান নই কিংবা তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কেও কখনাে আমাদের কিছু বলেননি। তিনি শুধু আমাদের সামনে বাস্তব উদাহরণ পেশ করেছিলেন। এক হাজার কথার চেয়ে একটা বাস্তব উদাহরণ অনেক বেশি শিক্ষনীয়, অবশ্য কারাে যদি শিক্ষা গ্রহণের ক্ষমতা ও আগ্রহ থাকে।
পরবর্তী ১৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে জামালের সাথে ধীরে ধীরে আমাদের যােগাযােগ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ওই যােগাযােগ দাঁড়ায় দু'সপ্তায় কিংবা সপ্তায় একবার করে। এর মধ্যে কোন সময়ই জামাল আমাদের কাছে তাঁর ধর্ম সম্পর্কে কিছু বলেননি, আমাদের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কেও কোন প্রশ্ন করেননি অথবা কখনাে অনুরােধ করেননি আমাদের মুসলমান হতে। তবে আমি নিজ হতে অনেক কিছুই জানতে শুরু করেছিলাম। প্রথমত জামাল নিয়মিত নামায পড়তেন, এটা ছিল তাঁর তরফ হতে আমার জন্য একটা ব্যবহারিক শিক্ষা।
দ্বিতীয়ত তাঁর দৈনন্দিন আচার আচরণ হতে আমি জানতে পারছিলাম তাঁর নীতি ও আদর্শবােধ কেমন। তাঁর ব্যবসায়িক নীতিবােধ কিংবা সামাজিক দায়বােধ সম্পর্কেও অবহিত হতে পারছিলাম। তৃতীয়ত তাঁর দু'সন্তানদের প্রতি ব্যবহার দেখেও আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমার স্ত্রীর জন্যও জামালের দৈনন্দিন আচার-আচরণ উদাহরণস্বরূপ ছিল। চতুর্থত মধ্যপ্রাচ্যের ঘােড়ার ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের গবেষণা কর্মে সাহায্য করার ফাঁকে ফাঁকে জামাল আলােচনা করতেন:১) আরব ও ইসলামের ইতিহাস থেকে নানা কাহিনী, ২)হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণিত হাদিসের বাণী ও শিক্ষা ৩)কুরআনের আয়াতসমূহ ও সেসব অবতীর্ণ হওয়ার পটভূমি। বস্তুত আমাদের প্রতিটি আলাপচারিতায় প্রায় ৩০ মিনিট ধরে আমরা ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতাম। কিন্তু তা ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ঘােড়ার ইতিহাস বুঝার সাথে সংশ্লিষ্ট। আমাকে কখনাে বলা হয়নি, "প্রকৃত ব্যাপার এ রকম" কিন্তু সব সময় বলা হত "সাধারণ মুসলমানরা এ রকম মনে করে বা বুঝে থাকে।" যেহেতু আমার কাছে ধর্ম প্রচার করা হত না এবং আমার ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে তিনি জানতে চাইতেন না তাই তাঁর কাছে আমার অবস্থান ব্যাখ্যা করারও কোন প্রয়ােজন পড়ত না। বস্তুত সমস্ত আলােচনা হত বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ হতে একাডেমিক উদ্দেশ্যে নেহাৎ ধর্মান্তকরণের জন্য নয়।
এরপর জামালের মাধ্যমে স্থানীয় মুসলিম আরব কম্যুনিটির সাথে আমাদের পরিচিতি গড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে ওয়ায়েল ও তাঁর পরিবার, খালিদ ও তাঁর পরিবারসহ আরাে কিছু পরিবার ছিল। আমি তাঁদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন যাত্রার বৈশিষ্ট্য খুব নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করেছি। আমরা সবাই একই আমেরিকান সমাজে বসবাস করেও মুসলমানদের দেখলাম উন্নততর নৈতিক জীবন যাপন করতে। মনে হল ইসলামের হয়তাে জীবনঘনিষ্ঠ এমন কিছু স্বতন্ত্র্য প্রায়ােগিক বৈশিষ্ট্য আছে, যা আমি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবনে অর্জন করতে পারিনি।১৯৯২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আমি নিজের অবস্থান ও কাজকর্ম গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করে দিলাম। এ সব চিন্তাভাবনায় নিন্মবর্ণিত অনুষঙ্গগুলাে প্রভাব ফেলেছিল:
১.পূর্ববর্তী ১৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে আমাদের সামাজিক জীবন স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সংসর্গে অতিবাহিত হয়েছিল।
সূত্রঃ মাসিক তরজুমান।
