জেরাল্ড এফ ডার্কস
৪ ডিসেম্বরের (১৯৯২) মধ্যে সম্ভবত আমাদের সমাজ জীবনের ৭৫% সময়ই কেটেছে আরব মুসলমানদের সাথে।
২.আমার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ যা আমি কলেজ ও সেমিনারিতে লাভ করেছি, তাতে ভালােভাবেই অবগত হয়েছি বাইবেলকে কত জঘন্যভাবে বিকৃত করা হয়েছে। কিভাবে কখন কাদের দিয়ে কেন বাইবেলের এ বিকৃতি ঘটানাে হয়েছে তাও আমি জানতম। বিধাতার তিন রূপে ত্রিত্ববাদে আমি বিশ্বাসী ছিলাম না। যীশু খৃষ্ট খােদার পুত্র একথা আমি রূপকার্থে বিশ্বাস করতাম, আল্লাহ তাঁর ওপর শান্তি বর্ষণ করুণ। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমি নিশ্চিতভাবে আস্তিক ছিলাম। তবে অন্যান্য মুসলিম বন্ধুদের মতই আমি ছিলাম এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহতেই বিশ্বাসী।
৩,আমার নিজস্ব মূল্যবােধ ও নৈতিক চেতনা আমার আশেপাশের খ্রিস্টানদের চেয়ে মুসলিমদের চিন্তা চেতনা ও মূল্যবােধের কাছাকাছি ছিল। তদুপরি আমার সামনে জামাল, খালিদ ও ওয়ায়েলের মত অবিতর্কিত ও নির্বিরোধ মানুষের বাস্তব উদাহরণও বিদ্যমান ছিল। মােট কথা আমি যে ধরনের সামাজিক আচার আচরণের আকাঙ্খা পােষণ করতাম, মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেই আমি তার প্রতিফলন দেখতে পেতাম।
আমেরিকান সমাজ নৈতিক দিক থেকে দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল কিন্তু আমেরিকান মুসলিম সমাজকে, যাদের সাথে আমি পরিচিত ছিলাম, সেই দেউলিয়াপনা স্পর্শ করেতে পারেনি। তাদের মাঝে বিয়ে বন্ধন ছিল নিবিড়, স্বামী-স্ত্রীগণ ছিলেন পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ। সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববােধ এবং পারিবারিক মূল্যবােধের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব আরােপ করা হত। আমি ও আমার স্ত্রী চেষ্টা করতাম তাদের মত জীবন যাপন করতে। এভাবে চলতে গিয়ে কয়েক বছর পর আমার মনে হল আমাদের জীবন যাত্রা একটা নৈতিক শূন্যতার মাঝ দিয়েই অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
চিন্তার বিভিন্ন সূত্র একত্রে জট পাকিয়ে একটা সমন্বিত রূপ পরিগ্রহ করল। আরবীয় ঘােড়া, আমার শৈশবের বেড়ে ওঠা, খ্রিস্টান চার্চ মিনিস্টারের দায়িত্ব পালন, সেমিনারি শিক্ষা, একটা নৈতিক মূল্যবােধ সম্পন্ন সমাজের জন্য আমার দুনিয়ার আকাঙ্খা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে আমার যােগাযােগ সবকিছু মিলেমিশে একটা একাকার রূপ নিল। আমার আত্মজিজ্ঞাসা বেড়ে চলল। চারিদিকে তাকিয়ে একটা প্রশ্নের মুখােমুখি হলাম আমি: মুসলিম বন্ধুদের সাথে কোন ব্যতিক্রমধর্মী বিষয়টি আমাকে তাদের থেকে পৃথক করেছে?একবার মনে হল আমি জামাল কিংবা খালিদকে এ প্রশ্নটা করতে পারি কিন্তু সে প্রশ্ন উত্থাপনের জন্য আমি তখনাে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারিনি। আমি কখনাে আমার ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে তাঁদের সাথে আলাপ করিনি। আমি কখনাে চিন্তা করিনি আমাদের বন্ধুত্বের মাঝে উত্থাপন করার প্রয়ােজন আছে কিনা। এ সব ভেবে আমি কলেজ ও সেমিনারি জীবনে ইসলাম সম্পর্কিত যে সব বই সংগ্রহ করেছিলাম, সেসব খুঁজে বের করলাম। চার্চের প্রচলিত ধর্মমত থেকে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের যতই গরমিল থাকুক, চার্চে আমি যতই কম যাতায়াত করি না কেন, তখন পর্যন্ত আমি নিজেকে খ্রিস্টান ছাড়া অন্য কিছু ভাবতাম না। তাই আমি ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য পশ্চিমা লেখকদের রচনা বেচে নিলাম। সে বছর ডিসেম্বরে পশ্চিমা পন্ডিতদের রচিত আধা ডজনের মত বই আমি পাঠ করেছি, তন্মধ্যে নবী মুহাম্মদ এর একটা জীবনচরিত ও অন্তর্ভূক্ত ছিল। তাঁর ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হােক।
এ সময় আমি কুরআন শরীফের দু'টো ভিন্ন ভিন্ন ইংরেজি অনুবাদ ও পাঠ করেছি। আত্ম আবিষ্কারের নেশায় আমার এ ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার কথা আমি কখনাে আমার মুসলিম বন্ধুদের জানাইনি। কী ধরনের বই পড়ছি কিংবা কেনই বা সেসব পড়ছি তার কিছুই আমি তাদেরকে বলিনি। তবে, মাঝে মাঝে তাদেরকে ঘিরে অতীতে আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেত। যদিও মুসলিম বন্ধুদের সাথে আমি এ সমস্ত বই সম্পর্কে কোন আলাপ করিনি কিন্তু আমার স্ত্রীর সাথে এ ব্যাপারে ব্যাপক আলােচনা হত। ১৯৯২ সালের ডিসেম্ববের শেষ সপ্তাহে আমি নিজের মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলাম আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও ইসলামের ধর্মীয় বিধানের মধ্যে সাংঘর্ষিক কিছুই নেই।হযরত মুহাম্মদ (তাঁর ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হােক) কেন নবী হিসাবে স্বীকার করতে আমার কোন দ্বিধা ছিল না। পাশাপাশি এক আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, একথা ঘােষণা করতেও আমার কোন অসুবিধা ছিল না।
তিনি মহান ও পরাক্রমশালী। তথাপি স্থির কোন সিদ্ধান্তে পৌছতে আমার দ্বিধা হচ্ছিল। আমি তাৎক্ষণিকভাবে নিজের কাছে স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলাম যে আমি যতদূর বুঝেছি খ্রিস্টান ধর্মের সংঘবদ্ধ চার্চের ধর্মমত থেকে ইসলামের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে আমার মতের মিল বেশি। আমি সেমিনারে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে যে জ্ঞান লাভ করেছি তাতে সহজেই বুঝতে পেরেছি যে, খ্রিস্টান ধর্ম, বাইবেল ও যীশু (তাঁর ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হােক) সম্পর্কে কুরআন যা বলেছে তা সর্বাংশে সত্য।(ক্রমশ)
সূত্রঃ মাসিক তরজুমান।
