জেরাল্ড এফ ডার্কস
বাহ্যত দেখতে গেলে আমি ছিলাম একজন প্রতিশ্রুতিশীল যুব মিনিস্টার, যার ছিল চমৎকার উচ্চ শিক্ষা, রােববার সকালের প্রার্থনা সভায় প্রচুর মানুষকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা, মিনিস্ট্রির প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্যের উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু ভেতরে আমি আমার মিনিস্টারের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সততা রক্ষার সংগ্রামে ছিলাম ক্ষতবিক্ষত। আমার মনের ভেতর চলছিল জোর লড়াই।
আমার সে লড়াই কিন্তু পরবর্তীকালে টেলি ইভানজেলিস্টদের সে অক্ষম লড়াইয়ের মত ছিলা না, যারা নিজেদের যৌন পবিত্রতা রক্ষার জন্য প্রাণপণ প্রয়াস চালাত। সে লড়াই বর্তমান সময়ের পত্রিকার শিরােনাম দখলকারী যাজকদের আন্দোলনের মতও ছিল না। তবে আমার সংগ্রাম ছিল ব্যক্তিগত সততা রক্ষার সে এক নাজুক ও কঠিন সংগ্রাম, যা উচ্চ ও উত্তম শিক্ষায় শিক্ষিত মিনিস্টারদের প্রায় সকলকেই মুকাবিলা করতে হয়।
সাধারণত সবচেয়ে উত্তম,মেধাবী, আদর্শবাদী ভাবী-মিনিস্টারদের উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তােলা হয়। যেমন তখনকার দিনে হার্ভার্ড ডিভিনিটি কলেজে করা হত। মনে হয় এ প্রয়াসের মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৌতুক লুকিয়ে আছে। কৌতুক এই যে,ব্যাপক শিক্ষা দিতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলাে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতকগুলাে ঐতিহাসিক সত্যের প্রকাশ না ঘটিয়ে পারে না। তার কয়েকটি হচ্ছেঃ
১) প্রাথমিক যুগে আদি মূলধারার চার্চের প্রতিষ্ঠা এবং কিভাবে ভূ-রাজনৈতিক কারণে তার ক্রম পরিবর্তন ঘটেছে,
২) বাইবেলের আদি ও অকৃত্রিম পাঠ, যা বর্তমান সাধারণ খ্রিস্টান জনগােষ্ঠীর পঠিত বাইবেলের পাঠের সাথে প্রচন্ডরূপে সাংঘর্ষিক, যদিও এ অসংগতির কিছু কিছু তথ্য পরবর্তীকালের বাইবেলের নবতর ও উন্নততর অনুবাদ সংস্করণে উল্লেখ করা হয়েছে,
৩) ত্রিত্ববাদের ধারণার ক্রম বিবর্তন ও যীশু খুষ্টকে খােদার পুত্র (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হােক)রূপে চিহ্নিত করার পর্যায়ক্রমিক বর্ণনা,
৪) ধর্ম-বহির্ভূত ধ্যান ধারণার অনুপ্রবেশ, যা পরবর্তীতে খৃষ্টান ধর্ম বিশ্বাস ও ডগমায় পর্যবসিত হয়েছে,
৫) আদি চার্চের অস্তিত্ব ও খৃষ্টান আন্দোলনসমূহের বিবরণ, যারা কখনাে ত্রিত্ববাদের ধারণাকে গ্রহণ করেনি বরং তীব্র
বিরােধিতা করেছে এবং যারা কখনাে যীশু খৃষ্টকে (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হােক) ঈশ্বর বা ঈশ্বর পুত্র বলে স্বীকার করেনি। এবং
৬) ইত্যাদি ,(প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কিছু সুফল আমি আমার সদ্য প্রকাশিত দ্য ক্রস এন্ড দ্য ক্রিসেন্ট: এন ইন্টার ফেইথ ডায়লগ বিটুইন ক্রিশ্চিয়ানিটি এন্ড ইসলাম বইতে বিস্তারিত
আলােচনা করেছি। প্রকাশক আমেনা পাবলিকেশন্স-২০০১)
এ জন্য বলা যায়, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই, এধরণের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত সেমিনারি গ্রাজুয়েটদের বেশির ভাগই গির্জার প্রচারবেদী আলােকিত করতে উৎসাহবােধ করেনা, যেখানে তাদের এমন কথা প্রচার করতে হয়, তাদের জানা মতে যা অসত্য। বরং তারা বিভিন্ন কাউন্সেলিং কর্মসূচিতেই যােগ দেন। আমার ক্ষেত্রও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। আমি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে মাস্টার্স ও ডক্টরেট করেছি। আমি নিজেকে খ্রিস্টান বলে পরিচয় দিতাম। কারণ প্রত্যেক মানুষের আত্মপরিচয়ের একটা প্রশ্ন তার অস্তিত্বের জন্যই প্রয়ােজন। তদুপরি আমি ছিলাম চার্চের একজন প্রাতিষ্ঠানিক মিনিস্টার। তবে আমি ছিলাম পেশাগতভাবে একজন সার্বক্ষনিক মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। অবশ্য আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমাকে ত্রিত্ববাদ ও যীশু খৃষ্টের (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হােক) খােদায়িত্ব সম্পর্কে আমার বিশ্বাস সংরক্ষণে সহায়তা করেছিল। (জনমত জরিপে একথা প্রায় সময়ই প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, মিনিস্টাররা খ্রিস্টান ধর্মের বিভিন্ন মতাদর্শে খুব কমই বিশ্বাস করে থাকে। "খােদার পুত্র" কে তারা রূপকার্থে গ্রহণ করে কিন্তু পাদ্রীগণ বিশ্বাস করে আক্ষরিক অর্থেই।) অতএব আমি নিছক "ত্রিস্টমাস ও ইস্টার ডে,খ্রিষ্টানে পরিণত হলাম। চার্চে যেতাম খুবই কালেভদ্রে। আর এখানকার বক্তৃতা শুনে আমি দাতে দাঁত ঘষতাম আর জিহ্বা কামড়াতাম, কারণ আমি জানতাম যা এখানে বলা হচ্ছে তা সত্য নয়।
আমার এ কথায় কেউ যেন মনে না করেন আমি কম ধার্মিক হয়ে পড়েছি বা চেতনাগতভাবে আগের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছি।আমি নিয়মিত প্রার্থনা করতাম। একজন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী স্রষ্টার অস্তিত্বে আমি দৃঢ় আস্থাশীল ছিলাম। শৈশবে চার্চে ও রােববার স্কুলে আমি যে, নৈতিক শিক্ষা পেয়েছি,তদনুযায়ী দৈনন্দিন জীবন যাপন করতাম। কিন্তু আমি বেশ ভালােভাবেই জানি, মানবসৃষ্ট ধর্মীয় মতবাদ এবং সংঘবদ্ধ চার্চ কর্তৃক রচিত ধর্মীয় বিধি বিধানগুলাে বিগত যমানার অংশীবাদিতা, বহু ঈশ্বরবাদ ও ভূ-রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা দ্বারা প্রবলভাবে আচ্ছন্ন।
২.সময় যতই গড়িয়ে চলল ততই আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম বৃহত্তম আমেরিকান সমাজ ক্রমশ ধর্ম হতে দূরে সরে যাচ্ছে দেখে। ধার্মিকতা মানুষের জীবনে একটা জীবন্ত অনুভূতি, হৃদয়ের শ্বাসপ্রশ্বাস, যা ব্যক্তির মনে নৈতিকতাবােধের জন্ম দেয়। ধার্মিকতাকে ধর্মাচারের সাথে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে
না। ধর্মাচার হচ্ছে, নিয়ম নিষ্ঠা, আচার অনুষ্ঠান, প্রথা পদ্ধতি, যা সংঘবদ্ধ চার্চ কর্তৃক উদ্ভাবিত ও প্রণীত। আমেরিকান সংস্কৃতি ক্ৰমশ নৈতিক ও ধর্মীয় নির্দেশনা হারিয়ে ফেলছে।
