যাকাতের গুরুত্ব,ফাযায়েল ও মাসায়েল (২)
মাওলানা মুহাম্মদ জিয়াউল হক
হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, "যে ব্যক্তি তার হালাল আয় থেকে একটি খেজুর পরিমাণ দান করে, আল্লাহ তা'আলা তা নিজ (কুদরতী) হাতে গ্রহণ করেন এবং তােমরা স্বীয় ঘােড়ার বাচ্চাকে যেভাবে লালনপালন কর তদ্রুপ যত্ন করে তা বৃদ্ধি করেন। এমনকি তার সওয়াব উহুদ পাহাড় পরিমাণ হয়ে যায়। (আহমদ)
যাকাত প্রদান না করার ভয়াবহতা:
যাকাত প্রদান না করা নিতান্তই খােদাদ্রোহীতা। এতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর ক্রোধের শিকার হওয়া নিশ্চিত। ভয়াবহতা সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের বাণী ভয়ানক ও ভীতিপ্রদ। পবিত্র কুআনে এরশাদ হয়েছে-যারা স্বর্ণ, রৌপ্য জমা করে এবং তা আল্লাহর পক্ষে খরচ করে না। (হে হাবিব) আপনি তাদেরকে যন্ত্রনাদয়ক শান্তির সংবাদ দিন। সে দিন জাহান্নামের আগুন নিঃসন্দেহে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তদ্দারা তাদের কপাল, পার্শ্বদেশ এবং পিঠকে সেঁক দেয়া হবে(এবং বলা হবে) এটা তার প্রতিফল যা তােমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করেছিলে। সুতরাং তােমাদের ধনভান্ডারের শাস্তি আস্বাদন কর। (তাওবা আয়াত ৩৪)
অন্য দিকে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর হাদীসে পাকে এর ভয়াবহতা এভাবে বর্ণনা হয়েছে-'তােমাদের কারও সংরক্ষিত মাল কিয়ামতের দিন কেশবিহীন বিষাক্ত সাপ হবে এবং দেখে সম্পদের মালিক পালয়ন করতে চাইবে কিন্তু সম্পদ তাকে অনুসন্ধান করতে থাকবে , যে পর্যন্ত না সে খাদ্যরূপে তার মুখে আপন আঙ্গুলিসমূহ দেয়। (মিশকাত শরীফ)
যাকাতের ব্যয় খাতসমূহ:
যাকাত আল্লাহ তা'আলার নির্দেশিত একটি অর্থনৈতিক ফরয ইবাদত। নির্দিষ্ট খাতে কিয়দাংশ দানের মাধ্যমে তা সম্পাদিত হয়। তবে এ নির্দিষ্ট অংশ সকলে সমভাবে ভােগ করার অধিকার নেই। তার জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। মহান রাব্বুল আলামীন সূরা তাওবার ৬০ নং আয়াতে যাকাতের ব্যয় খাতের একটি তালিকা প্রদান করেছেন। খাতগুলাে নিম্নে উপস্থাপন করা হল।
১.ফকীর- যাদের অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে জীবন দুঃখ কষ্টে অতিবাহিত হয়, কিন্তু লােক লজ্জায় কারাে কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে পারে না, তারাই ফকীর। ২. মিসকীন- যার কোন সম্পদ নেই, সেই মিসকীন। দৈহিক অক্ষম ব্যক্তিদের মিসকীন বুঝায়। যেমন অন্ধ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত পঙ্গু, মানসিক প্রতিবন্ধী ইত্যাদি। ৩.যাকাত আদায়কারী কর্মচারী- যারা যাকাত আদায় ও বন্টনের কাজে নিয়ােজিত তাদের বেতন-ভাতা হিসেবে যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে। ৪, ইসলামের প্রতি হৃদয় আকৃষ্টকরণ-ইসলামের দিকে মন আকৃষ্ট করার জন্য অমুসলিমদেরকে যাকাতের অর্থ দেয়া । তবে বর্তমানে ইসলামের বিজয় প্রতিষ্ঠা হওয়ায় খাতটিতে যাকাত প্রদানের বিধান রহিত হয়। ৫. দাসমুক্তি- যে ক্রীতদাস তার মালিকের সাথে এ চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে যে, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিলে সে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবে, তাহলে তার মুক্তির জন্য যাকাতের অর্থ প্রদান করা যায়। ৬. আল্লাহর রাস্তায়-যেসব মুজাহিদ অর্থাভাবে জিহাদে অংশগ্রহণ করতে পারে না, তাদের হাতিয়ার যানবহনও যুদ্ধাস্ত্র ক্রয় করার জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে। দ্বীনি ইলম অন্বেষণকারীও এ খাতে অন্তর্ভুক্ত। ৭, পথিক- যার বাসস্থানে সম্পদ আছে কিন্তু সাথে কিছুই নেই, সাময়িক রিক্ত হস্ত, এ ধরনের মুসাফির তথা ভ্রমণকারীদের কে যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে। ৮. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি। উপরিউক্ত ৮ শ্রেণীর প্রত্যেককে যাকাত দিতেই হবে এমন নয়। বরং যে কোন এক শ্রেণীকে দিলে যাকাত আদায় হয়ে যাবে।(শরহে বেকায়া ও কুদুরী)
যাদেরকে যাকাত দেয়া যাবে না:
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ৮ শ্রেণীর ব্যক্তিরাই যাকাতের হকদার,কিন্তু বিভিন্ন সহীহ হাদীসের আলােকে ওলামায়ে কেরাম কয়েক ধরনের নাম উল্লেখ করেছেন যারা ফকীর হলেও তাদেরকে যাকাত দেয়া যাবে না। এরা হলাে-নিজ সন্তান এবং সন্তানের সম্তান যত অধঃস্তন হােক। নিজ পিতামাতা ও দাদা এভাবে যত উর্ধ্বতন হােক ফরয সদকা দেয়া যাবে না। বনি হাশেম ও তাদের আযাদকৃত দাসদের ফরয সদকা দান করা যাবে না, যদিও তারা ফকীরের সংজ্ঞায় পড়ে, বনি হাশেম বলতে হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু, হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু, হযরত জাফর রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু,ও হযরত আকীল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও হাশেম বিন আবদুল মুত্তালিবের বংশধরকে বুঝায়। মসজিদ নির্মাণ কাজে যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে না। কাফনের কাপড় ক্রয়ের জন্য।
যাকাতের ধর্মীয় গুরুত্ব:
ইসলামের অন্যান্য ফরয হুকুমের মত যাকাত একটি ফরয হুকুম। ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম। নামায যেভাবে নামাযীর দেহকে পাপ, অন্যায়, অপরাধ ও অশ্লীলতা হতে বিরত রাখে, অনুরূপভাবে যাকাত যাকাতদাতার মালকে ধ্বংস ও বিনাশ হতে রক্ষা করে। যাকাতদাতা যথাযথ যাকাত আদায় না করে সম্পদ পুঞ্জীভূত করে রাখলে তার অবশিষ্ট সম্পদরাজি অপবিত্র ও ময়লাযুক্ত হয়ে যায়। এ অপবিত্র সম্পদের ব্যবহারের ফলে তার আর্থিক ও শারীরিক কোন ইবাদত কবুল হবে না আল্লাহর দরবারে। অতএব, যাকাত আদায়ের ফলে মুমিন ব্যক্তির আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়।
সুত্রঃ মাসিক তরজুমান
%20%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%9C%E0%A6%BE%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%B0%E0%A7%80%20%E0%A6%87%E0%A6%AB%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0%20%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%9C.jpg)